ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পরও জনপ্রশাসনে দুর্নীতি হ্রাসের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। আবার প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবাও বাড়েনি। সংস্থাটির ‘জনপ্রশাসনে শুদ্ধাচার : নীতি ও চর্চা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য ওঠে এসেছে। গতকাল রবিবার টিআইবির ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলে জনপ্রশাসন সম্পর্কিত ১১টি কৌশলের মধ্যে পাঁচটি কৌশলের চর্চা সন্তোষজনক। কিন্তু এখনো দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে জবাবদিহি নিশ্চিতে উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রে কৌশলের চর্চা শুরুই হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে জনপ্রশাসনে দক্ষ জনবল ও নিয়মতান্ত্রিক পদোন্নতি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাসহ ৯ দফা সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, জনপ্রশাসনের নীতি ও কৌশলে শূন্যপদে নিয়োগ এবং যোগ্যতা অনুযায়ী পদোন্নতি প্রদানের কথা থাকলেও এই দুই ক্ষেত্রেই ব্যাপক ঝুঁকি বিদ্যমান। বর্তমানে জনপ্রশাসনে ২৩ শতাংশ পদ শূন্য থাকলেও এসব পদে নিয়োগের বিশেষ কোনো প্রস্তুতি নেই মন্ত্রণালয়ের। সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্ষমতাসীন দলের ‘নিজের লোক’ হওয়া বিশেষ প্রধান যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় ও বিশেষ তদবিরে পদায়ন প্রকট আকার ধারণ করেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেও দীর্ঘ সময় লাগছে। সততা, মেধা, দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, প্রশিক্ষণ ও সন্তোষজনক চাকরি বিবেচনাক্রমে পদোন্নতির বিধান থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা উপেক্ষিত হয়। সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় না থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ‘গোয়েন্দা রিপোর্ট’ যুক্ত থাকায় এটির অপব্যবহার ও রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতির ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর নিজেদের লোককে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পদোন্নতি দিতে গিয়ে প্রায়ই জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, মেধাকে অগ্রাহ্য করছে। আবার কর্মকর্তারা পদোন্নতির আশায় রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।

গবেষণায় দেখা যায়, জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল ২০১২ প্রণীত হওয়ার ছয় বছর পার হলেও এতে জনপ্রশাসন সম্পর্কিত ১১টি কৌশলের মধ্যে প্রণোদনা ও পারিতোষিক, প্রশিক্ষণ, যৌক্তিক বেতন কাঠামো, সরকারি চাকরি আইন প্রণয়ন, সরকারি সেবায় ই-গভর্নেন্স প্রবর্তন এই পাঁচটি কৌশলের চর্চা সন্তোষজনক। যদিও বেতন বৃদ্ধির ফলে দুর্নীতি কমেছে তারও কোনো সুনির্দিষ্ট উদাহরণ নেই। অন্যদিকে বার্ষিক কর্ম-মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রবর্তন, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রদান (সুরক্ষা) আইন বাস্তবায়ন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘কর্মজীবন উন্নয়ন পরিকল্পনা’ প্রণয়ন— এই তিনটি কৌশলের চর্চা এখনো শুরু হয়নি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সরকারি চাকরি আইন’ নামটিই সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই আইনটির নাম হওয়ার কথা ছিল জনপ্রশাসন আইন। তাই আমরা আইনটির নাম সংশোধনের দাবি জানাই। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ফৌজদারি অপরাধে গ্রেফতারের জন্য সরকারের পূর্বানুমতি গ্রহণের বিধিও সম্পূর্ণরূপে সংবিধান পরিপন্থি ও বৈষম্যমূলক। এই বিধিও বাতিল করতে হবে।

জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্টদের বিবেচনার জন্য ৯ দফা সুপারিশ করেছে টিআইবি। এর মধ্যে ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধি, ১৯৭৯’-কে শুদ্ধাচার কৌশলের আলোকে হালনাগাদ করা, প্রতিবছর সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব প্রদান নিশ্চিত করা, জনপ্রশাসনের ওপরের পদগুলোতে অতিরিক্ত নিয়োগ না দিয়ে নিচের দিকের শূন্যপদগুলো পূরণ করা, টেকনিক্যাল ক্যাডার থেকে পদোন্নতি দেওয়া, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের দক্ষতার মূল্যায়ন-পূর্বক পদোন্নতি নিশ্চিত করা অন্যতম।

প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের মহাসচিব অধ্যাপক ড. পারভীন হাসান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। প্রতিবেদনটি প্রণয়ন ও উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মহুয়া রউফ।